আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে চর্চা চলছে, তা নতুন করে আরও গভীর হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই প্রেক্ষাপটেই আর জি কর হাসপাতালের দুর্নীতিকাণ্ডে প্রাক্তন ডেপুটি সুপার আখতার আলির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির ঘটনায় ফের উত্তাল রাজ্য রাজনীতি ও প্রশাসনিক মহল।
এই মামলায় বড়সড় মোড় আসে যখন সিবিআই-এর বিশেষ আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দেয়, আখতার আলিকে অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর নামে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। জানা যায়, একাধিকবার তলব করা সত্ত্বেও তিনি আদালতে হাজিরা দেননি। তাঁর তরফে জানানো হয়েছিল, তিনি অসুস্থ এবং বর্তমানে একটি নার্সিংহোমে ভর্তি। তবে আদালত সেই যুক্তি গ্রহণ না করে জানায়, ইচ্ছাকৃতভাবেই তিনি হাজিরা এড়িয়ে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে আর জি কর হাসপাতালের দুর্নীতিকাণ্ডে প্রাক্তন ডেপুটি সুপার আখতার আলির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়াকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
আদালতের কড়া মনোভাব নতুন নয়। গত বছরের ডিসেম্বর মাসেও আলিপুরের বিশেষ সিবিআই আদালত আখতার আলিকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছিল। আদালত তখনই জানিয়ে দেয়, নির্দিষ্ট দিনে হাজিরা না দিলে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হবে। সেই সময়েও আদালতের কড়া ধমকের পর তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, আর জি কর মেডিক্যাল দুর্নীতির মামলায় সিবিআই যে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট জমা দিয়েছে, সেখানে অভিযুক্তদের তালিকায় আখতার আলির নাম রয়েছে। যদিও সেই সময় তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তবুও তদন্তের গতি দেখে এখন আর জি কর হাসপাতালের দুর্নীতিকাণ্ডে প্রাক্তন ডেপুটি সুপার আখতার আলির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর হওয়াই সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের নভেম্বর মাসেই আখতার আলির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে সাসপেন্ড করে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন সংস্থাকে চিকিৎসা সংক্রান্ত সরঞ্জাম সরবরাহের বরাত পাইয়ে দেওয়ার বদলে তিনি আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। তদন্তে উঠে আসে, পরিবারের সদস্যদের জন্য বিমানের টিকিট কাটা, স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে টাকা নেওয়া এবং একাধিক সংস্থা থেকে একাধিকবার সুবিধা নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ। এমনকি প্রায় ৪ কোটি ১৪ লক্ষ টাকার বরাত পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। এই সমস্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতেই আর জি কর হাসপাতালের দুর্নীতিকাণ্ডে প্রাক্তন ডেপুটি সুপার আখতার আলির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়াকে তদন্তের বড় সাফল্য বলেই ধরা হচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আর জি কর মেডিক্যালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রথম তুলেছিলেন আখতার আলিই। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই সন্দীপ ঘোষ গ্রেফতার হন বলে জানা যায়। একসময় নিজেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা আখতার আলির নামই এখন গুরুতর অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছে। আদালতের নির্দেশের পর এখন নজর, কবে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং এই মামলায় তদন্ত আরও কোন কোন নতুন তথ্য সামনে আনে। তবে একথা স্পষ্ট, আর জি কর হাসপাতালের দুর্নীতিকাণ্ডে প্রাক্তন ডেপুটি সুপার আখতার আলির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দুর্নীতির তদন্তে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।





