Mamata Banerjee : ‘কৃষিও চলবে, শিল্পও চলবে’— সিঙ্গুরে শিল্প নিয়ে মোদীর নীরবতাকেই নিশানা করে কড়া বার্তা মমতার!
সিঙ্গুর (Singur) বাংলার রাজনীতিতে এই নামটা শুধু একটি জায়গার নয়, এক দীর্ঘ আন্দোলন, আবেগ আর বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বুধবার রতনপুরের ইন্দ্রখালির মাঠে সরকারি সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) আবারও সেই সিঙ্গুরকেই বেছে নিলেন শিল্প, কৃষি ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে। সাম্প্রতিক সময়ে এই সিঙ্গুরেই এসে সভা করে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। কিন্তু তাঁর ভাষণে শিল্প নিয়ে স্পষ্ট কোনও দিশা না থাকায় যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, সেই আবহেই মমতার বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
সভা শুরুর আগেই স্থানীয় মানুষের মধ্যে ছিল কৌতূহল— সিঙ্গুরের মাটি থেকে ঠিক কী বার্তা দিতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী? সেই প্রশ্নের উত্তর মিলতে শুরু করে বক্তব্যের প্রথম দিকেই। মমতা স্পষ্ট করে বলেন, রাজ্য সরকার শিল্পের বিরোধী নয়, তবে নীতি একটাই— কৃষিজমি দখল করে নয়, কৃষির সঙ্গে সহাবস্থান করেই শিল্প। তিনি জানান, সিঙ্গুরে ৮ একর জমির উপর ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তৈরি হয়েছে সিঙ্গুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক (Singur Agro Industrial Park)। সেখানে মোট ২৮টি প্লটের মধ্যে ইতিমধ্যেই ২৫টি বরাদ্দ হয়ে গিয়েছে। তাঁর কথায়, “কৃষিও চলবে, শিল্পও চলবে। কারও জমি কেড়ে নয়।”

শুধু এটুকুতেই থামেননি মুখ্যমন্ত্রী, তিনি জানান, সিঙ্গুরে ৭৭ একর জমিতে একটি প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক (Private Industrial Park) গড়ে তোলার কাজও এগোচ্ছে। সেখানে অ্যামাজন (Amazon) ও ফ্লিপকার্ট (Flipkart)-এর মতো বড় সংস্থা ওয়্যারহাউস তৈরির পরিকল্পনা করছে বলে দাবি করেন তিনি। মমতার বক্তব্য, এর ফলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান (Employment) হবে। এই প্রসঙ্গে কটাক্ষের সুরে তিনি বলেন, “আমরা মুখে বলি না, কাজে করি।” রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মন্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি তাঁর বার্তা।

“আমরা মুখে বলি না, কাজে করি।”
কারণ, গত ১৮ জানুয়ারি এই সিঙ্গুরেই সভা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বিজেপির অন্দরমহলে অনেকেই আশা করেছিলেন, সিঙ্গুরের মাটি থেকে শিল্প নিয়ে কোনও বড় ঘোষণা শোনা যাবে। কিন্তু বাস্তবে শিল্প প্রসঙ্গে মোদীর নীরবতাই বেশি চোখে পড়ে। বরং তিনি তৃণমূল শাসিত বাংলায় ‘জঙ্গল-রাজ’ চলছে বলে আক্রমণ করেন। বুধবারের সভা থেকে সেই প্রসঙ্গ টেনেই মমতা নিজের জমি আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরেন। বলেন, “সিঙ্গুরের জমি ফিরিয়ে না দিলে আমি নিজেকে বাজি রেখেছিলাম। মরার জন্য তৈরি ছিলাম। কথা দিয়েছিলাম, কথা রেখেছি।” এরপরই মোদীকে নিশানা করে বলেন, “শুধু মুখে বড় বড় বুলি দিলে হবে না। এই বুলি বাংলায় চলবে না।”
বক্তব্যের শেষ ভাগে উন্নয়ন ও প্রকল্পের খতিয়ান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। সভা থেকেই রাজ্যের ২০ লক্ষ উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে ‘বাংলার বাড়ি (গ্রামীণ)–২’ প্রকল্পের প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ২৪ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। পাশাপাশি তিনি উদ্বোধন করেন ১০৭৭টি প্রকল্প, যার আর্থিক মূল্য ৫৬৯৪ কোটি টাকা, এবং শিলান্যাস করেন আরও ৬১৬টি প্রকল্পের, ব্যয় ২১৮৩ কোটি টাকা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘোষণা আসে সভার একেবারে শেষে— ১৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান (Ghatal Master Plan)-এর শিলান্যাস।
ঘাটাল প্রসঙ্গে মমতা জানান, ঘাটালের সাংসদ দেব (Dev) দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রকল্পের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কেন্দ্রকে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও কোনও অর্থ মেলেনি। শেষ পর্যন্ত রাজ্য সরকারই নিজস্ব উদ্যোগে এই প্রকল্প শুরু করেছে। তাঁর দাবি, এই মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়িত হলে দুই মেদিনীপুরের পাশাপাশি হাওড়া ও হুগলির বিস্তীর্ণ এলাকা উপকৃত হবে। সিঙ্গুরের মঞ্চ থেকে শিল্প, কৃষি ও উন্নয়নের এই সমন্বিত বার্তাই এখন রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।





