ভোটের বছরে কেন্দ্রীয় বাজেট (budget 2026) মানেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই বাড়তি কৌতূহল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে কেন্দ্র কী বার্তা দেয়, সেদিকে নজর থাকে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিল্পমহল, রাজনৈতিক মহল—সকলেরই। সংসদে বাজেট পেশের দিন বাজেট ভাষণের শুরু থেকেই সেই উত্তেজনার রেশ টের পাওয়া যাচ্ছিল। আর ঠিক সেখানেই বাংলার জন্য এমন একটি ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ, যা এক ঝটকায় রাজ্যের শিল্প ও পরিকাঠামো উন্নয়নের আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনে দিল।

বাজেট ভাষণের মধ্যভাগে এসে অর্থমন্ত্রী জানালেন, পশ্চিমবঙ্গের ডানকুনিতে তৈরি হতে চলেছে একটি বিশেষ পণ্য পরিবহণ করিডর (Freight Corridor)। শুধু বাংলা নয়, একই ধরনের করিডর গড়ে তোলা হবে গুজরাটের সুরাতেও। শিল্প ও বাণিজ্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই দুই অঞ্চলকে সামনে রেখেই কেন্দ্রের এই পরিকল্পনা। ডানকুনি করিডরের মাধ্যমে পণ্য পরিবহণ আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং আধুনিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে লজিস্টিক খরচ কমবে, শিল্প সংস্থাগুলির প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা বাড়বে এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তকে যুক্ত করতে সাতটি হাইস্পিড রেল করিডর তৈরির ঘোষণাও করেন নির্মলা সীতারমণ, যা পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে।
শুধু রাস্তা বা রেল নয়, প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও বড় বিনিয়োগের কথা শোনা গেল বাজেটে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী জানালেন, ‘ভারতের সেমিকন্ডাক্টর মিশন ২.০’ আরও শক্তিশালী করা হবে। এই মিশনের আওতায় শিল্প-নেতৃত্বাধীন গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের গতি ধরে রাখতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্র। একই সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধা বা এআই (Artificial Intelligence)-এর ব্যবহার বাড়ানোর কথাও জানানো হয়। উৎপাদন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দেশকে প্রযুক্তির দৌড়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য বলে স্পষ্ট করা হয় বাজেট ভাষণে।

বাজেটে শিল্প ক্ষেত্রেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার কথা উঠে আসে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী জানান, খেলাধুলো সংক্রান্ত সরঞ্জাম তৈরিতে ভারতকে বিশ্বের অন্যতম সেরা দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ওড়িশা, কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুতে বিরল ধাতুর (Rare Minerals) হাব তৈরি করা হবে। খনি ক্ষেত্রেও জোর দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান নির্মলা সীতারমণ। বস্ত্রশিল্পে বিশেষ নজর দেওয়ার ইঙ্গিতও মেলে বাজেটে। খাদি ও গ্রামীণ বস্ত্রের ব্যবসা বাড়াতে ‘মহাত্মা গান্ধি গ্রাম স্বরাজ প্রকল্প’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশে তৈরি হবে মেগা টেক্সটাইল হাব, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
বাজেটের শেষ ভাগে এসে অর্থমন্ত্রী ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে সামনে রেখে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন। ভারতকে বায়ো ফার্মার হাবে পরিণত করার লক্ষ্যে ‘বায়োফার্মা শক্তি’ প্রকল্প চালু করা হচ্ছে, যার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গবেষণা, উৎপাদন ও উদ্ভাবনের উপর জোর দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা MSME ক্ষেত্রের জন্যও ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়। সব মিলিয়ে বাজেট ২০২৬-এ পশ্চিমবঙ্গকে ঘিরে পরিকাঠামো, শিল্প ও প্রযুক্তির যে ছবি তুলে ধরা হল, তা ভোটের বছরে রাজ্য রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার।





