সুপ্রিম কোর্টে IPAC–ED মামলার শুনানি পিছিয়ে যাওয়া মানেই শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়ার বিলম্ব নয়—বরং এই বিলম্বই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক গভীর রাজনৈতিক ও আইনি সংকটে ঠেলে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সুপ্রিমে শুনানি পেছতেই কেন বিরাট ফেঁসে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী?
ঘটনার সূত্রপাত সুপ্রিম কোর্টের প্রথম শুনানির দিনেই। সেদিন আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল—রাজ্য সরকার, রাজ্য পুলিশ, কলকাতা পুলিশ এবং স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে হলফনামা জমা দিতে হবে। কিন্তু আইনি রীতিনীতি মেনে নির্দিষ্ট সময়ে হলফনামা না দিয়ে, তা জমা পড়ে লেট-ইভনিং ও গভীর রাতে। এখানেই শুরু বিতর্ক ।

‘I-PAC কাণ্ডে ফেঁসে গেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়…’, আক্রমণ শুভেন্দুর
আইনজ্ঞদের মতে, এই দেরিতে হলফনামা জমা দেওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই Enforcement Directorate (ED) ও কেন্দ্রের আইনজীবীরা পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাননি। ফলে সুপ্রিম কোর্ট শুনানি কনক্লুড করতে পারেনি এবং এক সপ্তাহের সময় দেয়। পরবর্তী শুনানি ধার্য হয়েছে ১০ তারিখ, মঙ্গলবার।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিলম্ব কি শুধুই প্রশাসনিক গাফিলতি? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও গভীর হিসাব ?
মুখ্যমন্ত্রী যে হলফনামা জমা দিয়েছেন, তার বক্তব্য ও তাঁর আগের প্রকাশ্য বক্তব্যের মধ্যে গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়েছে বলে দাবি বিরোধীদের। আদালতে দাখিল করা হলফনামায় বলা হয়েছে—ED অনুমতি নিয়েই নাকি কিছু নথি ও ডিভাইস সংগ্রহ করেছিল। অথচ জনসমক্ষে, লাইভ প্রেস কনফারেন্সে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই দাবি করেছিলেন—“অনুমতি ছাড়াই আমার ফাইল ও মোবাইল নেওয়া হয়েছে।”
এই দুই বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে একটাই প্রশ্ন উঠে আসে—কোনটা সত্য?
আর এখানেই আসে সবচেয়ে বিতর্কিত অভিযোগ—মোবাইল ফোন ও নথি ‘চুরি’ প্রসঙ্গ। বিরোধীদের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে মোবাইল ফোন নেওয়ার ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী নিজেই স্বীকারোক্তিমূলক অবস্থানে চলে গেছেন। এমনকি ল্যাপটপ সংক্রান্ত বক্তব্যেও বারবার বদল লক্ষ্য করা গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে তা আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়তে পারে। আর সেই কারণেই মুখ্যমাত্রীর পাশাপাশি রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিক—নন্দিনী চক্রবর্তী, রাজীব কুমার ও মনোজ ভার্মার নামও আলোচনায় উঠে এসেছে।
এদিকে ED-র পক্ষের সিনিয়র আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে স্পষ্ট জানিয়েছেন—হলফনামা তারা পেয়েছেন গভীর রাতে, ফলে আইনগতভাবে পাল্টা জবাব প্রস্তুত করতে সময় প্রয়োজন। আদালত সেই যুক্তি মেনে নেয়।
রাজনৈতিক মহলে এখন চর্চা—এই বিলম্ব আসলে রাজ্য সরকারের কৌশল ছিল কি না। কারণ শুনানি পিছোনো মানেই মামলার আগুন নিভে যাওয়া নয়, বরং আগুন আরও ছড়িয়ে পড়া।
লাইভ ল’ সহ একাধিক আইনি প্ল্যাটফর্মে ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও হলফনামার ভিডিও ক্লিপ, ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ ঘুরছে। সবই পাবলিক ডোমেনে।
বিরোধীদের সাফ কথা—“আইন সবার জন্য সমান। সাধারণ মানুষ হলে যা হতো, মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত।”
এখন নজর ১০ তারিখের দিকে। সুপ্রিম কোর্টে ED কী জবাব দেয়, আদালত কোন পথে হাঁটে—তার উপর নির্ভর করছে এই মামলার ভবিষ্যৎ। তবে এটুকু নিশ্চিত, সুপ্রিমে শুনানি পেছতেই কেন বিরাট ফেঁসে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী—এই প্রশ্ন আর এড়িয়ে যাওয়ার জায়গায় নেই।
রাজনীতি ও আইনের এই সংঘাতে শেষ কথা বলবে আদালত। কিন্তু ততদিন বিতর্ক থামছে না, বরং আরও তীব্র হচ্ছে।





