নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা (Voter List) ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু এ বার, প্রশ্নের মুখে SIR প্রক্রিয়া, সেই বিতর্ক পৌঁছে গেল একেবারে নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) পোর্টাল এবং সিস্টেমের গভীরে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, কমিশনের পোর্টালের মধ্যেই এমন একটি সিস্টেম ত্রুটি রয়েছে, যার মাধ্যমে অজান্তেই ভোটারের নাম বাদ পড়ে যাচ্ছে। শুধু অভিযোগ নয়, এর অকাট্য প্রমাণ তাঁর কাছে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার দিল্লির চাণক্যপুরীর বঙ্গভবন থেকে সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক স্পষ্ট করেন, রাজ্য সরকার বা তৃণমূল কংগ্রেস SIR-এর বিরোধী নয়। আপত্তি রয়েছে যেভাবে কোনও প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা ছাড়াই এই প্রক্রিয়া কার্যকর করা হচ্ছে, তা নিয়ে। তাঁর কথায়, নোটবন্দি (Demonetisation) বা লকডাউনের (Lockdown) মতোই অপরিকল্পিত ভাবে SIR চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদি সত্যিই ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রয়োজন ছিল, তা হলে ২০২৪-এর জুন থেকেই এই কাজ শুরু করা যেত। তখন কোনও নির্বাচন ছিল না, সময় নিয়ে অ্যাপ তৈরি করে, স্বচ্ছ ভাবে কাজ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু নোটিফিকেশন এল অনেক পরে, ফর্ম বিতরণও দেরিতে—যা গোটা প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
অভিষেকের আরও অভিযোগ, বাংলাকে টার্গেট করেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, দেশের আরও ১১টি জায়গায় যেখানে SIR হচ্ছে, সেখানে বাংলার মতো নিয়ম নেই। শুধুমাত্র বাংলার জন্য শতাধিক মাইক্রো অবজার্ভার (Micro Observer) নিয়োগ করা হয়েছে। অথচ SIR নোটিফিকেশনে স্পষ্ট লেখা ছিল—ERO (Electoral Registration Officer)-ই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ। তা হলে এই মাইক্রো অবজার্ভাররা এল কোথা থেকে? অভিযোগ, ERO-দের বসিয়ে রেখে মাইক্রো অবজার্ভাররা ব্যাকএন্ডে লগ ইন করে নিজের ইচ্ছেমতো কেস ডিসমিস করছেন।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি আসে কমিশনের পোর্টালের কার্যপ্রণালী নিয়ে। অভিষেক ব্যাখ্যা করে জানান, পোর্টালে Micro Observer Observation এবং Roll Observer Observation-এর জন্য আলাদা আলাদা কলাম রয়েছে। যদি এই অবজার্ভেশন ERO-এর মতের সঙ্গে না মেলে, তা হলে ERO-র সামনে একটি নতুন পেজ খুলে যায়। সেখানে দু’টি অপশন থাকে—
১) আমি মাইক্রো অবজার্ভারের সঙ্গে সহমত
২) আমি মাইক্রো অবজার্ভারের সঙ্গে সহমত নই
এখানেই ভয়ঙ্কর বিপদ, যদি কেউ দ্বিতীয় অপশন অর্থাৎ “সহমত নই”-তে ক্লিক করেন, কেস ক্লোজ হয়ে যায়। কিন্তু ভুলবশত অন্য অপশনে ক্লিক করলেই ভোটারের নাম সরাসরি ডিলিট (Voter Name Deletion) হয়ে যাচ্ছে। অভিষেকের দাবি, এই প্রযুক্তিগত ত্রুটির সুযোগ নিয়েই ভোটার তালিকা থেকে পরিকল্পিত ভাবে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।
এই অভিযোগগুলি সামনে আসতেই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে—ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে। যদি সত্যিই কমিশনের সিস্টেমে এমন ত্রুটি থাকে, তা হলে লক্ষ লক্ষ ভোটারের ভোটাধিকার বিপন্ন হতে পারে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, এই বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি সরাসরি গণতন্ত্রের মেরুদণ্ডে আঘাত।
এখন দেখার, নির্বাচন কমিশন এই গুরুতর অভিযোগের জবাব কী ভাবে দেয় এবং আদৌ কি SIR প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফেরাতে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়? নাকি ভোটার তালিকা নিয়ে এই বিতর্ক আরও গভীর হবে—সে দিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।





