দেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী মুহূর্তের সাক্ষী থাকল সুপ্রিম কোর্ট। মুখ্যমন্ত্রী পদে বহাল থেকেও দেশের সর্বোচ্চ আদালতে নিজেই সওয়াল করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে লড়তে আসেননি, তাঁর লড়াই ন্যায়ের জন্য। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কালো চাদর জড়িয়ে প্রধান বিচারপতির এজলাসে শুরু থেকেই শেষের সারিতে বসে থাকেন তিনি। নিজের মামলার শুনানি শুরু হলে সামনের সারিতে এগিয়ে এসে পাঁচ মিনিট সময় চান বক্তব্য রাখার জন্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করার এই দৃশ্য দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন আইনজ্ঞদের একাংশ।
আদালতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আবেগঘন ভাষায় বলেন, “সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা ন্যায্য বিচার পাচ্ছি না। যখন ন্যায়বিচার দরজার আড়ালে কাঁদছে, তখন কোথাও ন্যায়বিচার নেই।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে আরও জানান, তিনি নির্বাচন কমিশনকে একাধিক চিঠি লিখেছেন, কিন্তু কোনও উত্তর পাননি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তিনি নিজেকে খুবই কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মনে করেন এবং দলের জন্য নয়, ন্যায়ের জন্যই তাঁর এই লড়াই।
শুনানির সময় মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, কেন অসমে এখনও এসআইআর হয়নি, অথচ ২৪ বছর পরে হঠাৎ করে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর চালু করা হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে অভিযোগ করেন, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি থেকে আট হাজারের বেশি মাইক্রো অবজারভার এনে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি কটাক্ষ করে একে “হোয়াটসঅ্যাপ কমিশন” বলে উল্লেখ করেন।
সওয়ালের একপর্যায়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে কিছু ছবি দেখাতে চান এবং অভিযোগ করেন, সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশ মানা হচ্ছে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করবেন—এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই বহু মানুষ ভার্চুয়াল মাধ্যমে শুনানিতে যোগ দিতে চান। রিপোর্ট অনুযায়ী, নির্ধারিত সীমার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ অনলাইনে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন, যা আদালতের নজর কাড়ে।
যদিও প্রাথমিক শুনানিক্রমে মুখ্যমন্ত্রীর মামলার উল্লেখ ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর সংক্রান্ত মামলা ছিল তালিকার ২১ নম্বরে এবং মুখ্যমন্ত্রীর আবেদন ছিল ৩৭ নম্বরে। পরে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শুনানির কথা জানানো হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করার ফলে শুনানির ক্রম নিয়েও দিনভর নানা জল্পনা তৈরি হয়।
এই মামলায় মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুসংগঠিত। তিনি চান, ২০২৫ সালের ২৪ জুন এবং ২৭ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের জারি করা এসআইআর সংক্রান্ত নোটিফিকেশন বাতিল করা হোক। পাশাপাশি, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকার ভিত্তিতেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন করানোর নির্দেশ দিক সুপ্রিম কোর্ট । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে আরও দাবি করেন, এসআইআরে সব সরকারি নথি গ্রহণ করতে হবে এবং মাইক্রো অবজারভার নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে বাতিল করতে হবে।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক সীমারেখা ছাড়িয়ে এই ঘটনা এখন এক বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে দাঁড়িয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যে বার্তা দিলেন, তা শুধু রাজ্যের নয়, গোটা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে যে নজির গড়লেন, তার প্রভাব আগামী দিনে কতটা গভীর হয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে দেশ।





