বিশ্ব রাজনীতিতে এখন অর্থনীতিই সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক হাতিয়ার। কোন দেশ কার সঙ্গে বাণিজ্য করছে, সেটাই ঠিক করে দিচ্ছে ভবিষ্যতের ক্ষমতার সমীকরণ। এই বাস্তবতায় ইউরোপ, আমেরিকার পর এবার পশ্চিম এশিয়া ভারতের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একের পর এক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান আরও মজবুত করতে চাইছে নয়াদিল্লি। সেই লক্ষ্যেই এবার উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে বড় সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে মোদির ভারত।
কিছুদিন আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করেছে ভারত। তার পরেই আমেরিকার তরফে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির ঘোষণা আসে। এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ইউরোপ, আমেরিকার পর এবার পশ্চিম এশিয়া ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকারের তালিকায় উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে একাধিক অঞ্চলের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে বাণিজ্য বাড়াতে পারে।
জিসিসি(GCC) দেশগুলি কেন ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ
ইউরোপ, আমেরিকার পর এবার পশ্চিম এশিয়া—এই ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতামূলক পর্ষদ বা গাল্ফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (GCC)। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরিন—এই ছ’টি দেশ নিয়ে গঠিত এই জোট। দীর্ঘদিন ধরেই এই দেশগুলির সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। শুধু জ্বালানি নয়, শ্রম, পরিষেবা ও পণ্যের ক্ষেত্রেও এই দেশগুলির সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ গভীর।
বাণিজ্যের অঙ্ক বলছে সম্ভাবনার কথা
পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট হয় কেন ইউরোপ, আমেরিকার পর এবার পশ্চিম এশিয়া ভারতের জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে ভারত ও জিসিসি দেশগুলির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ পৌঁছেছে প্রায় ১৭ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারে। এই অঙ্ক আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলে এই বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলে কী লাভ ভারতের
ইউরোপ, আমেরিকার পর এবার পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে ভারত শুল্ক ছাড়াই জিসিসি দেশগুলিতে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। এর ফলে ভারতীয় কৃষিপণ্য, ওষুধ, টেক্সটাইল, গয়না এবং ক্ষুদ্র শিল্পজাত পণ্যের বাজার আরও বড় হবে। একই সঙ্গে এই দেশগুলি থেকে তেল ও গ্যাস আমদানিও আরও সহজ ও স্থিতিশীল হবে।
সরকারি বার্তা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি জিসিসি-র সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতায় সই করেছে ভারত। সেই সময় কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানান, পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর কথায়, ইউরোপ, আমেরিকার পর এবার পশ্চিম এশিয়া ভারতের জন্য শুধু বাজার নয়, বরং এক দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার।
বিশেষজ্ঞদের মতে কেন এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রসংঘের উপদেষ্টা জেফ্রি স্যাক্সের মতে, শুধুমাত্র আমেরিকার বাজারের উপর নির্ভরশীল থাকলে ঝুঁকি বাড়ে। ইউরোপ, আমেরিকার পর এবার পশ্চিম এশিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ায় ভারতের অর্থনীতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার বাজার একসঙ্গে ধরতে পারলে ভারতের রপ্তানি শক্ত ভিত পাবে।
ভবিষ্যতের পথে ভারতের লক্ষ্য
সব মিলিয়ে ইউরোপ, আমেরিকার পর এবার পশ্চিম এশিয়া ভারতের বাণিজ্যনীতিতে এক নতুন অধ্যায় খুলে দিতে চলেছে। এই চুক্তি শুধু আর্থিক লাভ নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের অবস্থানও আরও দৃঢ় করবে। বিশ্ব অর্থনীতির বদলাতে থাকা পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য ভবিষ্যৎ সুরক্ষার একটি বড় পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।






