বাংলার রাজনীতিতে আবারও বড়সড় ধাক্কা। দীর্ঘদিনের বাম-কংগ্রেস সমীকরণে ছেদ টেনে বিধানসভা নির্বাচনে একলা লড়বে কংগ্রেস—এই ঘোষণায় নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। ভোটের মুখে এই সিদ্ধান্ত কি আত্মঘাতী, না কি কংগ্রেসের অস্তিত্ব বাঁচানোর শেষ চেষ্টা—তা নিয়েই এখন রাজ্য রাজনীতি উত্তাল।
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের সঙ্গে জোট করে লড়েছিল কংগ্রেস। সেই জোট থেকেই তারা প্রধান বিরোধী দলের তকমা পায়। কিন্তু এরপর ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে জোট কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোট আরও বড় ধাক্কা খায়। সেই পরাজয়ের পর থেকেই কংগ্রেসের অন্দরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—জোট কি আদৌ কংগ্রেসকে বাঁচাতে পারছে? এই বিতর্কের মধ্যেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে—আগামী ভোটে একলা লড়বে কংগ্রেস।

চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের পর প্রদেশ কংগ্রেসে বড় সাংগঠনিক পরিবর্তন আনা হয়। অধীর চৌধুরীকে সরিয়ে সভাপতি করা হয় শুভঙ্কর সরকারকে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল—জোট রাজনীতি কংগ্রেস কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। মাঠের কর্মীরা চাইছেন দল নিজের পরিচয়ে লড়ুক। সেই দাবিই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরা হয়। ফলে ধীরে ধীরে সিদ্ধান্তের দিকে এগোয় হাইকমান্ড—বাংলায় একলা লড়বে কংগ্রেস।
বৃহস্পতিবার দিল্লিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এবং কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মীরের বৈঠকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মীর স্পষ্ট জানান, সিপিএমের সঙ্গে জোট হলে কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। সেই কারণেই দল এবার একাই লড়াইয়ের পথে হাঁটছে। অর্থাৎ, আসন্ন বিধানসভা ভোটে একলা লড়বে কংগ্রেস—এতে কোনও আপস নেই।
এই ঘোষণার পরই অস্বস্তিতে বাম শিবির। সিপিএম নেতৃত্বের দাবি, বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিরোধী ঐক্য ভাঙা মানেই শাসকদলের সুবিধা করে দেওয়া। তাঁদের মতে, কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে ভুল। তবে কংগ্রেস নেতৃত্বের পাল্টা যুক্তি—কংগ্রেস কোনও দলের ছায়ায় রাজনীতি করবে না। নিজেদের সংগঠন মজবুত করতেই এবার একলা লড়বে কংগ্রেস।
জোটসঙ্গী আইএসএফও এই ঘোষণায় চাপে। একমাত্র বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি এখনও আশাবাদী, শেষ মুহূর্তে সমীকরণ বদলাতে পারে। তবে বাস্তবতা বলছে, কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে বিরোধী শিবিরে আরও ভাঙন স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থায় সবচেয়ে লাভবান হতে পারে তৃণমূল, কারণ বিরোধী ভোট আরও ভাগ হবে।
তবে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ মহলের দাবি আলাদা। তাঁদের মতে, বারবার জোট করে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হওয়ার চেয়ে একা লড়ে সংগঠন ফের গড়ে তোলাই শ্রেয়। পরাজয় হলেও দল নিজের শক্তি বুঝতে পারবে। সেই কৌশলেই এবার ঝুঁকি নিয়ে ঘোষণা—একলা লড়বে কংগ্রেস। প্রশ্ন একটাই, এই সাহসী সিদ্ধান্ত কি কংগ্রেসকে ঘুরে দাঁড়ানোর রাস্তা দেখাবে, নাকি আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেবে?





