টালিগঞ্জের বহু অভিনেতার জীবনে রাজনীতি এসেছে হঠাৎ করেই। কেউ এসেছেন জনপ্রিয়তার জোরে, কেউ আবার দলের প্রয়োজনে। তবে সময় যত গড়ায়, দায়িত্বের ভার ততই ভারী হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে সেই ভার বইতে বইতেই অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—আর কতদিন? ঠিক তেমনই এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে অভিনেতা-বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর জীবনে। একদিকে রুপোলি পর্দার ব্যস্ততা, অন্যদিকে মানুষের প্রত্যাশা, দলের চাপ ও প্রশাসনিক দায়—সব মিলিয়ে অভিনেতা-রাজনীতিকদের পথটা যে খুব সহজ নয়, তা বারবারই সামনে এসেছে। ভোটের মুখে দাঁড়িয়ে সেই বাস্তবতার কথাই যেন আবার নতুন করে উঠে এল এক পরিচিত মুখের কণ্ঠে। আর তাতেই রাজ্য রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা।
আগামী বিধানসভা ভোটের আগে শনিবার বিধানসভা চত্বরে দাঁড়িয়েই এক বড় সিদ্ধান্তের কথা জানালেন তৃণমূল কংগ্রেসের তারকা বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। তিনবারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি জানিয়ে দিলেন, এবার আর ভোটে লড়তে চান না। আর বিধায়কের গুরুভারও নিতে প্রস্তুত নন। চিরঞ্জিত স্পষ্ট করে জানান, নিজের এই মনোভাব ইতিমধ্যেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানিয়ে দিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে এখনও তাঁর হাতেই রয়েছে, সেটাও মনে করিয়ে দেন অভিনেতা-বিধায়ক।
চিরঞ্জিতের বক্তব্যেই আসল জল্পনার বীজ। তাঁর কথায়, “১৫ বছর হয়ে গেল, সব দেওয়া সম্ভব নয়। যতটা পেরেছি, দিয়েছি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেবেন।”
এই একটি লাইনের মধ্যেই ধরা পড়ে দীর্ঘ ক্লান্তি, দায়িত্বের চাপ এবং একপ্রকার অব্যাহতির আবেদন। গত তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে লড়ে তিনবারই জয় পেয়েছেন তিনি। বারাসাত বিধানসভা কেন্দ্রের মানুষ বারবার আস্থা রেখেছেন তাঁর উপর। তবু এত বছরের পর রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ভাবনা যে গভীর, তা আর গোপন থাকল না।
আসলে এই সিদ্ধান্ত একদিনে আসেনি। সম্প্রতি নিজের বিধানসভা কেন্দ্র বারাসাতে একটি অনুষ্ঠানে চিরঞ্জিত যে বক্তব্য দেন, তা কার্যত বিদায়ী ভাষণের মতোই শোনায়। সেখানে তিনি বলেন, “কষ্ট আসছে। যদি চলে যেতে হয়… ভাবনাটা আছেই। আমি তো বলছিই, আমি থাকব না বেশিদিন।” তিনি আরও জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বারবার ধরে রেখেছেন। তবে এবার কী হবে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এই বক্তব্যের পর থেকেই বারাসাতের রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়—তাহলে কি সত্যিই এবার আর প্রার্থী হবেন না চিরঞ্জিত?
চিরঞ্জিতের এই সুর অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে অব্যাহতি চেয়েছিলেন তিনি । তখন বলেছিলেন, “রাজনীতির লোক নই। আমি অ্যাপলিটিক্যাল পারসন। রাজনীতি আমার কাপ অফ টি নয়।” তাঁর দাবি ছিল, প্রয়োজনের সময় দাঁড়িয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু রাজনীতিকে স্থায়ী পেশা হিসেবে দেখেননি কখনও। এবারও ভোটের আগে সেই একই সুর শোনা যাচ্ছে তাঁর গলায়।
চিরঞ্জিত চক্রবর্তী বরাবরই স্পষ্টভাষী। বহুবার তাঁর মন্তব্য শিরোনামে এসেছে। ২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ নিয়েও তিনি বিতর্ক তৈরি করেছিলেন। তখন বলেছিলেন,
“এই ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকাটাও শক্ত। তাই রাজনীতি অনেকের কাছে একটা বিকল্প হয়ে ওঠে।” এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, টালিগঞ্জ ও রাজনীতির মধ্যে টানাপোড়েন কতটা গভীর। আর এবার ভোটের আগে সেই দ্বন্দ্বই যেন ফের প্রকাশ্যে এল।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—শেষ পর্যন্ত বারাসাতে কী হবে? চিরঞ্জিত চক্রবর্তী কি সত্যিই এবার সরে দাঁড়াবেন? নাকি দলনেত্রীর সিদ্ধান্তে আবারও প্রার্থী হতে বাধ্য হবেন? ভোটের আগে অভিনেতা-বিধায়কের এই ভিন্নসুর তৃণমূলের অন্দরমহলে যেমন আলোড়ন ফেলেছে, তেমনই সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল বাড়িয়েছে। শেষ সিদ্ধান্ত যাই হোক, চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর এই ঘোষণায় যে আসন্ন বিধানসভা ভোটে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে, তা বলাই যায়।





