২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক স্তরে বড় ইঙ্গিত—বাংলায় এক দফায় ভোট করানোর পক্ষেই মত দিচ্ছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর। সিইও মনোজকুমার আগরওয়ালের দফতরের অভ্যন্তরীণ আলোচনা থেকে স্পষ্ট, নির্বাচন কমিশন পরামর্শ চাইলে রাজ্য প্রশাসন এক দফায় ভোট করানোর প্রস্তাবই দেবে। বার্তা পরিষ্কার—দীর্ঘ ভোটপর্ব নয়, সংক্ষিপ্ত ও কেন্দ্রীভূত নির্বাচনেই ঝুঁকছে রাজ্য।
সিইও দফতরের যুক্তি, অতীতে পশ্চিমবঙ্গে এক দফায় ভোট হয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতা প্রশাসনের কাছে নতুন নয়। এক আধিকারিকের বক্তব্য, একাধিক দফায় ভোট হলে নিরাপত্তা, লজিস্টিকস এবং প্রশাসনিক ব্যস্ততা বেড়ে যায়। তার তুলনায় এক দফায় ভোট হলে বাহিনী মোতায়েন, নজরদারি এবং ভোটপরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি কার্যকর হয়।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আট দফায় ভোট হয়েছিল বাংলায়। অতিমারির আবহে নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সেই সময় থেকেই এক দফায় ভোট না হওয়ার প্রশ্নে নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্র সরকার এবং বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন—অন্য রাজ্যে কম দফায় ভোট সম্ভব হলে বাংলায় কেন নয়।
প্রশাসনিক মহলের মতে, এবার এক দফায় ভোট প্রসঙ্গ সামনে এনে আগাম সেই বিতর্কের ধার ভাঙতে চাইছে সিইও দফতর। এপ্রিল-মে মাসে একাধিক রাজ্যের সঙ্গে একসঙ্গে নির্বাচন হলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর চাপ পড়বে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে বাহিনী আটকে রাখার চেয়ে এক দফায় ভোট করে দ্রুত নির্বাচন শেষ করাই বাস্তবসম্মত—এমন মত উঠে আসছে।
বাংলার ভোট মানেই হিংসার অভিযোগ—এই পরিচিত ছবিও এক দফায় ভোট যুক্তির পক্ষে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশাসনের একাংশের দাবি, ভোট যত দীর্ঘ হয়, রাজনৈতিক উত্তেজনা তত বাড়ে। বোমাবাজি, সংঘর্ষ, হানাহানি—এই চক্র ভাঙতে হলে একদিনেই ভোট মিটিয়ে দেওয়া কার্যকর হতে পারে। সেই কারণেই আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নেও এক দফায় ভোট প্রশাসনের কাছে গ্রহণযোগ্য বিকল্প।
তবে সমস্যা একটাই—পর্যাপ্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী। চলতি বছরে বাংলা ছাড়াও একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন থাকায় এক দফায় ভোট হলে বিপুল সংখ্যক বাহিনী একসঙ্গে দরকার হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সেই চাহিদা পূরণ করতে পারবে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এই জায়গাতেই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক দলগুলিও প্রকাশ্যে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। শাসকদলের বক্তব্য, এক দফায় ভোট হোক বা বহু দফা—তারা প্রস্তুত এবং মানুষের উপরই ভরসা রাখে। বিরোধী শিবিরের দাবি, দফার সংখ্যা নয়, নির্বাচন কতটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে সেটাই আসল। তবু বাস্তবে এক দফায় ভোট নিয়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতির কথা প্রকাশ্যে এনে কমিশনের উপর চাপ বাড়াল সিইও দফতর।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এক দফায় ভোট এখন আর শুধুই রাজনৈতিক স্লোগান নয়—এটি প্রশাসনিকভাবে বিবেচনাধীন একটি বাস্তব প্রস্তাব। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশনই, তবে রাজ্যের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—বাংলা এক দফাতেই ভোটে যেতে প্রস্তুত। ২০২৬-এর ভোটের আগে এই এক দফায় ভোট ইস্যুই যে বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হবে, তা এখনই স্পষ্ট।





