বাজেট অধিবেশন মানেই শুধু হিসেব-নিকেশ বা অর্থনৈতিক আলোচনা নয়, রাজনীতির উত্তাপও থাকে তুঙ্গে। চলতি বিধানসভা অধিবেশনেও তার ব্যতিক্রম হল না। সংখ্যালঘু ইস্যু ঘিরে ফের উত্তাল হয়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা (West Bengal Assembly)। বক্তব্যের কেন্দ্রে উঠে এল অগ্নিমিত্রা পাল, পাল্টা প্রতিবাদে সরব ফিরহাদ হাকিম, আর সেই বিতর্কের মাঝেই হঠাৎ করেই ফিরে এল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নাম—তাও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মুখে।
বিধানসভায় বাজেট বক্তৃতার আলোচনায় বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল বলেন,
“ক্রিমিনাল সংখ্যালঘুদের রক্ষা করাই এই সরকারের একমাত্র কাজ।”
এই মন্তব্যের পরই সভাগৃহে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। শাসক ও বিরোধী—দুই শিবিরের মধ্যে কথার লড়াই ক্রমশ চরমে পৌঁছয়। এই বক্তব্য ঘিরেই মূলত তৈরি হয় সংখ্যালঘু বিতর্ক (Minority Issue in Bengal Politics), যা পরে ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে।
অগ্নিমিত্রা পালের বক্তব্যে তীব্র আপত্তি জানান মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। তিনি সরাসরি বলেন,
“স্বাধীনতা আন্দোলনে বহু সংখ্যালঘু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। সব সংখ্যালঘু মানুষ ক্রিমিনাল নন। আপনাদের ধিক্কার জানাই।”
এখানেই থামেননি তিনি। ফিরহাদের দাবি, এই মন্তব্যের জন্য অগ্নিমিত্রা পালকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। এই মুহূর্ত থেকেই বিধানসভায় তরজা আরও তীব্র হয়ে ওঠে, যা লাইভ রাজনীতির অন্যতম চিত্র হয়ে ওঠে।
ফিরহাদের বক্তব্যের জবাবে অগ্নিমিত্রা পাল বলেন,“সংখ্যালঘু মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবদান আমরা জানি। কিন্তু এই সরকার সংখ্যালঘুদের হাতে বন্দুক তুলে দিচ্ছে।”
এই অভিযোগ নতুন করে বিতর্কের পারদ চড়িয়ে দেয়। শাসকদলের বিরুদ্ধে সরাসরি নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা (Law and Order in West Bengal) নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। দিনভর এই মন্তব্য ঘিরেই উত্তাল থাকে বঙ্গ রাজনীতির আঙিনা।
এই বিতর্কের মাঝেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হঠাৎই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রসঙ্গ টেনে আনেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, প্রায় দুই দশক আগে রাজ্যের অনুমোদনহীন খারেজি মাদ্রাসা (Illegal Madarsa in Bengal) নিয়ে সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সেই মন্তব্য তখনও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, আজও সেই প্রসঙ্গ রাজনীতিতে ফিরে ফিরে আসে।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন,
“বুদ্ধবাবু সৎ ছিলেন। ওনার অনেক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল।”
তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন, সিপিএমের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বুদ্ধদেবের ভূমিকা নিয়ে তাঁর সমালোচনা থাকবে। নন্দীগ্রামে গুলি চালনার প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু বলেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাতে আসলে সিপিএম ছিল না।
শুভেন্দু আরও জানান, নন্দীগ্রামের গুলি চালনা নিয়ে প্রশ্ন তুললে বুদ্ধদেব তাঁকে নিরুপম সেনের কাছে চিঠি লিখতে বলেছিলেন। তাঁর কথায়,
“ব্যক্তি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দুর্নীতি পছন্দ করতেন না বলেই ‘চোরেদের মন্ত্রিসভা’ বলে বেরিয়ে এসেছিলেন।”
যদিও পরে তিনি ফের দলে ফিরে যান। তবে শুভেন্দুর দাবি, ব্যক্তি হিসেবে বুদ্ধদেব অন্যদের তুলনায় আলাদা ছিলেন এবং তাঁকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, সংখ্যালঘু রাজনীতি (Minority Politics), মাদ্রাসা বিতর্ক এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অতীত মন্তব্য—এই তিনের মেলবন্ধনেই ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল বিধানসভা। বদলেছে সরকার, বদলেছে সময়, কিন্তু পুরনো রাজনৈতিক অধ্যায় এখনও বর্তমান রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের রসদ জোগাচ্ছে।
এই বিতর্কই প্রমাণ করছে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অতীত কখনও পুরোপুরি অতীত হয়ে যায় না।





